লেখক:

তাহমিদ-উল-ইসলাম,

দশম শ্রেণি,

বরিশাল মডেল স্কুল ও কলেজ, বরিশাল



মানুষের মন বা মস্তিষ্ক পৃথিবীর সবচাইতে জটিল এবং রহস্যময় জিনিস। প্রাচীনকাল থেকে মস্তিষ্ক নিয়ে কিন্তু কম হৈচৈ হয়নি, কেউ বলেছেন মানুষের হৃদপিণ্ডই হল তার মন, সেখান থেকেই তার চিন্তা-ভাবনা, কাজ-কর্ম নিয়ন্ত্রিত হয়। আবার কেউ কেউ মনকে অতিপ্রাকৃত কোনও জিনিস বলে মনে করেন, বিশ্বাস করেন মানুষ মরে গেলেও সেই মানুষের সত্ত্বা মরে যায় না- আত্মা হয়ে ঘুরে বেড়ায়।

আসলে আমাদের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা মূলত নিজেকেই বুঝতে চাওয়া, নিজেই নিজেকে নিয়ে গবেষণা করা। মন নিয়ে চিন্তা করতে করতে একসময় মানুষ ভূত-প্রেতের মতো ভিত্তিহীন জিনিসকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। তবে, আধুনিককালে এটা প্রমাণিত বিষয় যে, মানুষের মস্তিষ্কই তার মন এবং এই মন থেকেই তার হাত, পা, চোখ, মুখ- পুরো শরীর নিয়ন্ত্রিত হয়।

শরীর থেকে যেমন মনকে আলাদা করা যায় না, তেমনি শরীরের স্বাস্থ্য থেকে মনের স্বাস্থ্য আলাদা করা যায় না। শারীরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ফলে অনেক সময়ই মনে সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ে। কাজেই, সুস্থ শরীর যদি কেউ অর্জন করতে চায়, তবে তার আগে মনটাও ভালো রাখতে হয়। আবার কারও যদি শরীর খারাপ হয় (ধর, তুমি ঝালমুড়ি খেয়েছ রাস্তার পাশ থেকে এবং সেই কারণে তোমার পেটে ব্যথা হচ্ছে) তখন মন কি ভালো থাকে? কোনও দিন না।

তোমাদের মধ্যে অনেকেই খুঁতখুঁতে, অনেকেই দেখা যায় ছবি আঁকার সময় গাছের পাতা হলুদ হবে নাকি নীলচে সবুজ হবে- সেটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। আবার অনেক সময় দেখা যাত যে, অনেকে কারো কাছ থেকে টাকা নিলে তিন-চারবার গুণে নাও ঠিক আছে কিনা। এসব নিয়ে আমাদের কোন সমস্যা হয় না।

তবে অনেক সময় দেখা যায় যে, কেউ কেউ অতিরিক্ত রকম খুঁতখুঁতে- বাড়াবাড়ি রকমের খুঁতখুঁতে, কোন কাজ পুরোপুরি পারফেক্টবা নির্ভুল করার জন্য চেষ্টা করতে থাকো। আবার পারফেক্ট হলেও ওভার পারফেক্ট করার জন্যে চেষ্টা করতে থাকো! আর এসব করতে গিয়ে তোমাদের দৈনন্দিন কাজে ছেদ পড়ে। একই চিন্তা বারবার আসে, যদিও অর্থহীন চিন্তা না করলে দুনিয়ার কোনও উনিশ-বিশ হবে না, কিন্তু চিন্তাটাকে যতদূরে সরাও সে ততই কাছে আসে। 

ধরো তোমার মনে একটা প্রশ্ন আসলো- আচ্ছা, আমি কি পরীক্ষায় এ+ পাবোতুমি চিন্তা করলে যে, হ্যাঁ পাবো। কারণ যা লিখেছি সবই সঠিক হবার কথা। কিছুক্ষণ পরে হয়তো আবার চিন্তা এলো আসলেই কি ঠিক লিখেছিতখন তুমি আবার চিন্তাটা করতে শুরু করলে। আবার খানিকক্ষণের জন্যে চিন্তাটা চলে গেলো। কিন্তু সেই চিন্তা বারবার ফিরে আসে। তুমি যদি ক্লাসে বসে এসব চিন্তাভাবনা করতে থাকো, তবে দেখবে তোমার পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আবার অনেক সময়ই কিন্তু তুমি তোমার হাতের লেখা সুন্দর করতে চাইছ- বারবার একই জিনিষ নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা করছ। হয়তোবা তুমি একবার হাত ধুলেই হয়, সেখানে বারবার হাত ধুচ্ছো- যদিও তার কোনও প্রয়োজন নেই। এমন সময় হাত ধুতে ধুতে হয়তো তোমার হাতে ঘাঁ হয়ে গেল!

আমাদের অনেকেই এরকম বাড়াবাড়ি রকম খুঁতখুঁতে কিংবা শুচিবায়ুগ্রস্থ যা তোমার পড়াশোনা বা পারিবারিক জীবনকে দুঃর্বিষহ করে তুলেছে। আর তুমি মনে করো যে এটি শুধু তোমারই হয়- আর কারও হয় না। এজন্য তুমি অপরাধ বোধে ভুগছ! তাহলে এই লেখাটি তোমার জন্যেই লেখা।

প্রথম কথা হল, একই চিন্তা যদি বারবার আসে কিংবা একই কাজ তুমি অকারণে বারবার কর, তবে বুঝতে হবে তুমি অবসেশনে ভুগছ।

একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় অবসেশন থাকলে তা নিয়ে খুব সমস্যা হয় না- তবে তা যদি খুব বেশি পরিমাণে হয়, যা তোমার মানষিক পীড়ার কারণ হয়েছে, তবে তোমার প্রথম কাজ হল বাবা-মা কিংবা বড় কাউকে- যাকে তোমার বিশ্বাস হয়, তাকে জানানো। আর অবসেশনের এই রোগটিকে বলা হয় ওসিডি বা অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার।

চিকিৎসায় অনেকসময়ই এটি ঠিক হয় না। (বিজ্ঞানীরা এখনো এর সঠিক কারণ আবিষ্কার করতে পারেন নাই) তবে কেউ চাইলে অবসেশনকে নিয়ন্ত্রণ করে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

আরেকটা ব্যাপার হল আমি নিজেও এই সমস্যাটায় ভুগছি, তবে আমি এখন এটিকে নিয়ন্ত্রণ করে বেশ স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারছি। এক্ষেত্রে আমার নিজের কিছু পদ্ধতি আছে যা এই অসুখটা থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে!

              তুমি একা নও: ওসিডি রোগীরা অনেকসময়ই মনে করে এই সমস্যাটা শুধু তাদেরই এককভাবে আছে। কিন্তু এ ধারণাটি মোটেও ঠিক না। তুমি নিশ্চয়ই হ্যারি পটার সিনেমা দেখেছ? হ্যারি পটার চরিত্রে অভিনয় করেন ড্যানিয়েল  র‍্যাডক্লিফ- তিনি কিন্তু ওসিডিতে ভুগেন। আবার যদি তোমরা ইংরেজি সাহিত্যের খোঁজখবর রাখো, তবে নিশ্চয়ই স্যামুয়েল জনসনের নাম শুনেছ? তিনিও কিন্তু ওসিডিতে ভুগতেন। যারা খেলা পছন্দ কর, তারাও নিশ্চয়ই ইংল্যান্ডের ফুটবলার ডেভিড বেকহ্যামের নাম শুনেছ? তারও কিন্তু অবসেশন আছে। এরকম তুমি যদি গুগলে একটা সার্চ দাও, তবে হাজার হাজার বিখ্যাত লোকদের দেখতে পাবে, যারা অবসেশনে ভুগতেন। তাই বলে কি তাদের জীবন চলেনি? তারা কি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হননি? তবে তুমি হবে না কেন?

             মনে রেখো কেউই ১০০% পারফেক্ট নয়: তুমি যদি অবসেশনে ভুগ, তুমি নিশ্চয়ই নিজেকে শতভাগ নিখুঁত করতে চাও, কিন্তু তুমি কি জানো যে আমরা কেউই শতভাগ নিখুঁত নই। হোক না একটু ভুল! একটু হাসির সঙ্গে কান্না থাকুক না! তুমি এমন কোনও মানুষ পাবে না যে শতভাগ নিখুঁত। তুমি যদি একজন মানুষকে দেখ সফল, তবেও তুমি তার কাজে-কর্মে-কথা-বার্তায় ভুল দেখবে। কাজেই, মোটামুটি নিখুঁত জীবনযাপনই স্বাভাবিক লোকেরা করে থাকে।

             পাত্তা দিয়ো না: জানো তো, অবসেশন একটা দানব! তুমি যদি একে পাত্তা দাও, তবে এটি একসময় ফ্র্যাঙ্কএস্টাইন হয়ে তোমাকে আক্রমণ করবে।

তোমার যদি একই চিন্তা বারবার আসে- তবে সেই চিন্তাটিকে ইগনোর করে যাও। আসতে দাও। একসময় পাত্তা না পেয়ে সে তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। অল্পসময় সহ্য করলেই দেখবে অবসেশনের শক্তি কমে যাচ্ছে। একসময় দেখবে অবসেশন জিনিষটা তোমার কাছে আসতে ভয় পাচ্ছে!

আসলে তোমার কাছে অবসেশন যতই সত্যি মনে হোক না কেন, এটা মিথ্যা! তোমার ব্রেনের কয়েকটা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার তারতম্য মাত্র!

            ভালোলাগায় মনোনিবেশ কর: আমি জানি তুমি বই পড়তে, গান শুনতে, খেলাধুলা করতে ভালোবাসো! সবসময় তোমার ভালোলাগার কাজটি করতে থাকো। যদি অবসেশন আসে, তখন একটা থ্রিলার কিংবা সায়েন্স ফিকশন পড়তে পারো। তাহলে এডভেঞ্চারের গল্প তোমাকে ভালো রাখবে, নিরর্থক চিন্তা থেকে দূরে রাখবে, দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখবে- এক সময় তুমি তা ভুলে যাবে।

        একশ জন লোকের মাঝে প্রায় তিন জনের, সঠিকভাবে বলতে গেলে প্রতি একহাজার জনের মাঝে প্রায় ২৭ জনের অবসেশনের অসুখ আছে, কাজেই ভয় পাওয়ার কিছু নেই, অবসেশনকে ইগনোর করে অনেকেই বেঁচে আছে- তুমিও বেচে থাকবে।

আমাদের শরীর যখন কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমালে আমাদের ব্রেন সবকিছু গুছিয়ে নেয়, শরীরের ক্লান্তি দূর হয়। তাই, পর্যাপ্ত ঘুম তোমাকে, তোমার মনকে ভালো রাখে। তুমি যদি ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম কর তবে তোমার ব্রেন থেকে প্রয়োজনীয় হরমোন নিঃসৃত হবে, ফলে শরীর মন উভয়ই ভালো থাকবে।

এইতো গেল আমার ওসিডিকে মোকাবিলা করার গল্প, তুমি নিশ্চয়ই এবার থেকে এই সমস্যাটাকে দূর করতে পারবে।

আমি জার্নালে এটি লিখলাম কারণ এই পদ্ধতিগুলো তোমায় ভালো রাখতে সহায়তা করবে এবং এগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত- শূন্যগর্ভ প্রতিশ্রুতি নয় কিন্তু!

 

তথ্যসূত্রঃ

১) http://goo.gl/xa0Xh

২) http://goo.gl/QKZKAm

৩) http://goo.gl/pfKOHx

8) কিশোর আলো- তোমাদের প্রশ্ন আমার উত্তর বিভাগ- মুহম্মদ জাফর ইকবাল (নভেম্বর ২০১৪)