লেখক:

জাবের ইবনে তাহের 

দশম শ্রেণি  

মতিঝিল মডেল হাই স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা 



অসীম এমন একটা ধারণা যা আমাদের অনুভূতিকে শিহরিত করে । সসীমতা ধারণ করে অসীম কে বুঝা আসলে বেশ কঠিন ব্যাপার । তবুও মানুষ কৌতূহলী , সে এই কঠিন বিষয়টাকেও ফেলে দিতে চায় না।  তাকে বুঝতেই হবে বুঝতে গিয়ে সে দেখেছে তার মাঝেও রয়েছে অসীম। সীমার মাঝেই যে অসীম !

আর বিন্দু হচ্ছে ক্ষুদ্রতার শেষ সীমা।  

অসীম আর বিন্দুর মত ক্ষুদ্রতাকে বুঝতে গিয়ে আমাদের যে কত নাকানি চুবানি খেতে হয়েছে তা নিচের প্যারাডক্সটা থেকেই বুঝা যায় –

 

ধরুন, আমি একটা ইট ছুড়লাম ইটটা ১০ মিটার দূরে গিয়ে পরল । এখন আমি ইটটা ছোঁড়ার সময় থেকে ১০ মিটার দূরে গিয়ে পরার আগ পর্যন্ত ইটটার অসংখ্য ছবি তুলেছিআচ্ছা বলুন তো ছবিতে ইটের গতি বেগ কত ? আসলে ছবিতে ইটটার গতি শুন্য । সেইখানে ইটের কোনও গতি থাকতে পারে না। ছবিটা একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে ইটটির অবস্থা প্রকাশ করছে । আমরা জানি মুহূর্তের সময় ব্যবধান শুন্য।সুতরাং সেইখানে ইটের গতিবেগ ও শুন্য । 

এখন আমরা যদি ইটের এক স্থান থেকে অন্য একটা স্থানে যাওয়াকে এরকম অসীম মুহূর্তের সমষ্টি মনে করি, তবে আমাদের ভাবতেই হবে জগতে গতি বলে কিছুই নেই । কারন সবগুলো ছবিতে (মুহূর্তে) ইটের শুন্য গতি । তবে একটা গতিহীন বস্তু কিভাবে একস্থান থেকে অন্য একটা স্থানে যেতে পারে ? তবে কি পুরো জগতটাই একটা ভ্রান্তি । আমরা কি সেই ভ্রান্তির মাঝেই বসবাস করছি । সময় , গতি এসবের কি কোন অস্তিত্বই নেই ? সবই কি আমাদের দেখার , বুঝার ভুল ?

 

চলুন, সমস্যাটাকে সমাধান করা যাক । আচ্ছা আমি যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি সংখ্যা রেখায় ১ এর ঠিক পরের বিন্দুর অবস্থান টা কোথায় ? আপনি কি বলবেন ? ২ ?

না সংখ্যারেখায় একের আরও কাছের বিন্দু রয়েছে , আমি যদি এবার বলি ১.০৫

এবার আপনি বলতে পারেন ১.০০০১

আমি এবার ১ এর আরও কাছের সংখ্যার কথা বলতে পারি ১.০০০০০০০০০০০১

এভাবে আমরা অসীম কাল পর্যন্ত যেতেই থাকব কিন্তু ১ এর ঠিক পরের বিন্দুর অবস্থানটা আমরা কখনই বলতে পারব না। (এখানে আমরা একের ঠিক পরের সংখ্যাটাকে , সংখ্যা না বলে বিন্দু বলেছি, এতে কোন অসুবিধা নাই )

বিন্দু জিনিসটা কি ?

আমি খাতায় কলম দিয়ে একটি ফোঁটা আঁকলাম, এটা কি একটা বিন্দু ? আমি হলপ করে বলতে পারি আপনি এটাকে বিন্দু বলবেন ।  

কিন্তু আমরা যেই পিথাগরিয়ান বিন্দুর কথা কল্পনা করি , তার কিন্তু মাত্রা শুন্য, আয়তনও নেই । অথচ আপনি যেই জিনিসটাকে বিন্দু বলেছেন খুব সূক্ষ্ম যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষা করলে দেখতে পাবেন , এর একটা দৈর্ঘ্য আছে । এটা কিছুটা জায়গাও দখল করেছে । কালির একটা স্তর তার উপরে পরেছে , তাই এর একটা উচ্চতাও রয়েছে । যাকে আমরা আলোচনার সুবিধার জন্য বিন্দু বলে থাকি তা আসলে আমাদের সেই পিথাগরিয়ান বিন্দু নয় , যা শুন্য মাত্রার, শুন্য আয়তনের । পিথাগরিয়ান এই বিন্দুকে আপনি কোনও কিছুর মাঝেই নির্দিষ্ট করতে পারবেন না । কারন তা অনেক ছোট , শুননের অসীম পরিমাণ নিকটে , এই বিন্দু অসীম পরিমাণ ক্ষুদ্র । আপনি যেমন কোন কিছুর মাঝে পিথাগরিয়ান বিন্দুর অবস্থান বলতে পারছেন না , ঠিক তেমন ভাবেই আপনি সংখ্যারেখায় একের ঠিক পরের বিন্দুর অবস্থানটাও বলতে পারছেন না ।সংখ্যা রেখায় ১ এর ঠিক পরের সংখ্যা বা বিন্দুর অবস্থান বলা আর যেকোনো জায়গায় একটি বিন্দুর অবস্থান নির্দিষ্ট করা আসলে একই ব্যাপার। আমাদের এই সীমাবদ্ধতা কেন, তা একটু পরেই বলব।

যাই হোক, গনিতে ১ এর ঠিক পরের সংখ্যাটিকে এইভাবে প্রকাশ করা হয় –

মনে করি , ১ এর ঠিক পরের বিন্দুটি হচ্ছে X

সুতরাং


  এখানে ধরি, a=1 |

বুঝানো হয়েছে যে , ‘x’ tends to ‘a’ অর্থাৎ x অসীম কাল ধরে a এর কাছে যাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যেখানে x  এর সীমা হচ্ছে a বা ১ ।

সংখ্যারেখায় ১ এর ঠিক পরের বিন্দুটি বা সংখ্যাটি ধরতে গিয়ে আপনি x  আর ১ এর ব্যবধান শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন ,যেখানে ‘x’ এর সীমা হচ্ছে ১। তবুও আপনি ১ এর পরের বিন্দুটি বলতে পারছেন না । কারন x  আর ১ এর ব্যবধান শুধুমাত্রই একটি বিন্দু , যা অসিমতর ক্ষুদ্র এবং আমরা তা নির্দিষ্ট করতে পারি না । এ থেকে বুঝা যায় আমরা চাইলেই যত ইচ্ছে ছোট কোনও কিছু ভাবতে পারি না।  আর একটি পিথাগরিয়ান বিন্দুর মত ক্ষুদ্র কোনও কিছুকে তো নয়ই । তো যা আমরা কল্পনা করতে পারছি না , কোনও কিছুর মাঝে তার অবস্থানটুকু কি করে বলব ?

এতক্ষণ আমরা আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানলাম । চলুন এবার এই জ্ঞানটাকে কাজে লাগানো যাক ।  আমরা বলেছি ইচ্ছে মত ছোট জিনিস জ্ঞাপন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর অন্যদিকে বাস্তবে দেখা যায় একটা নির্দিষ্ট মাত্রার চাইতে ছোট কোন কিছু হতেই পারে নাএই মাত্রাটা হচ্ছে প্ল্যাঙ্ক স্কেল ।আমাদের এই চিরাচরিত জগতে প্ল্যাঙ্ক স্কেল এর চাইতে ক্ষুদ্র সময় যেমন নাই , তেমনিভাবে এত ছোট দৈর্ঘ্যও নাই । এই প্ল্যাঙ্ক স্কেল আবার পিথাগরিয়ান বিন্দু থেকে ছোট নয় কিন্তু । তার তুলনায় অনেক বড়।  

তো আপনি যখন বলেন ইটটির গতিবেগ শুন্য,কারন প্রতিটি ছবিতেই সে স্থির। সেখানে কিন্তু একটি ভুল থেকেই যায় । ভুলটি হচ্ছে সত্যই ছবিতে ইটের বেগ শুন্য । কিন্তু আপনি যখন ছবি তুলছেন প্রতি দুইটা ছবি অন্তর কিছুটা সময় ব্যয় হচ্ছে । যার সর্বনিম্ন মান হচ্ছে প্ল্যাঙ্ক সময় । আপনি দুইটি পরপর তোলা ছবি লক্ষ করলে দেখতে পাবেন ইটটি প্রথম তোলা ছবিতে যেই অবস্থানে , দ্বিতীয় তোলা ছবিতে তার অবস্থানের সর্বনিন্ম হবে ব্যবধান  প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যইটটি পরের ছবিতে কিন্তু বিন্দু ব্যবধান অতিক্রম করে নি । যা করেছে তার সীমা প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য , যা পিথাগরিয়ান বিন্দুর চাইতে অনেক অনেক বড় । এবার বোঝা গেল গলদটা যে গোড়াতেই ।


তথ্যসূত্র –

    ০১। প্রানের মাঝে গণিত বাজে- সৌমিত্র চক্রবর্তী

    ০২। wikipedia/zeno’s paradoxes.

    ০৩।www.slate.com/what is the answer to zeno’s paradox?

    ০৪।Black, Max (1950-1951). “Achilles and the Tortoise,” Analysis 11, pp. 91-101

    ০৫। Arntzenius, Frank. (2000) “Are there Really Instantaneous Velocities?”, The Monist 83, pp. 187 - 208