লেখক:

মীর তাফহীম মাহমুদ 

অষ্টম শ্রেণী 

লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, কুমিল্লা 


স্কিজোফ্রেনিয়া’ নামটিতে কেমন যেন ‘গ্রিক-গ্রিক’ ভাব আছে। আর হবে নাই বা কেন? কারণ এই নামটি এসেছেই তো গ্রিক শব্দ থেকে। তাই এই নামটি ‘গ্রিক-গ্রিক’ মনে হয়। শব্দটির উৎপত্তি গ্রীক শব্দমূল skhizein (σχίζειν, "to split" )এবং phrēn, phren- (φρήν, φρεν-; "mind" ) থেকে ৷

যাই হোক গ্রিক নামগুলো থেকে বুঝা যাচ্ছে এটি আমাদের কোনো এক ধরনের মনের রোগ যা সব কিছু ওলটপালট করে দেয়।

স্কিজোফ্রেনিয়া রোগটি মানুষের মাথা কীরকম ওলটপালট করে দেয় তার একটি ছবি নিচে দেওয়া হলোঃ

 


এই কাপড়টি একজন স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী তৈরী করেছে।

 

 

সেন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের দেয়ালে এই ছবিটি এক স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যাক্তি নিজের নোখ দিয়ে এঁকেছেন।

 

আসলে স্কিজোফ্রেনিয়া একটি মারাত্মক মনরোগ। এই রোগটি বেশিরভাগ (১৩-২৫) বছর বয়সের মধ্যে হয়ে থাকে। এমনি সব বয়সেই এই রোগ হয়ে থাকে। এই রোগ একজন মানুষের চিন্তা-ভাবনা, প্রকৃতি সব কিছুই অস্বাভাবিক করে তোলে। তাছাড়া এই রোগের মাত্রা যদি অতিরিক্ত মাত্রায় হয় তাহলে মানুষ পাগল হয়ে যেতে পারে আবার মারাও যেতে পারে। তাই এই রোগটিকে আমাদের মনের ক্যান্সার বা এইডস বলা হয়ে থাকে। এই রোগে আক্রান্ত মানুষেরা সাধারণ মানুষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের বেশিরভাগই সারা জীবণ এই রোগকে সঙ্গী করে কাটান। কিন্তু কেউ কেউ যথাসময়ে চিকিৎসার ফলে আরোগ্য হয়।

 

স্কিজোফ্রেনিয়ার কারণসমূহঃ

 

স্কিজোফ্রেনিয়া কেন হয় তা এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে কিছু কারণ বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেনঃ

  • বংশগতঃ  কিছু গবেষণায় দেখা গেছে জিনগত কিছু সমস্যার জন্য স্কিজোফ্রেনিয়া হয়ে থাকে।
  • পরিবেশগতভাবেঃ স্কিজোফ্রেনিয়া রোগীদের সঙ্গে মেলামেশা করলেও এই রোগের সম্ভাবনা থাকে।
  • জন্মের আগে বাচ্চাদের ওজন কম থাকাঃ স্কিজোফ্রেনিয়ার কারণগুলোর মধ্যে এটি একটি প্রধাণ কারণ। বাচ্চাদের যদি জন্মের আগে ওজন কম থাকে তাহলে তাদের মস্তিষ্কের গঠনেও বড় ধরণের প্রভাব ফেলে। এরকম বেশি হয়ে থাকে জময বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। 
  • শৈশবের স্মৃতিঃ শৈশব কালের ভয়াবহ কোনো স্মৃতির কারণেও স্কিজোফ্রেনিয়া হয়ে থাকে।    
  • ইনফেকশনঃ শৈশবে কোনো ভাইরাসগঠিত অসুখ বা গর্ভাশয়ে থাকাবস্থায় কোনো ইনফেকশন হলে স্কিজোফ্রেনিয়ার ভয় থাকে।
  • মাদক দ্রব্যঃ বিভিন্ন ধরণের মাদক দ্রব্য গ্রহণের ফলে মস্তিষ্ক অনেকটা অকেজো হয়ে পড়ে যার ফলে এই রোগের ঝুঁকি থাকে।
  • অষুধঃ আমরা অনেক সময় অনেক কারণে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অসুধ খেয়ে থাকি। অষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলেও এই রোগের আশঙ্কা থাকে।    

 

তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীর মতে এটি পরিবেশের প্রভাবেই বেশি ছড়ায়। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে অবাক হয়েছেন এটা যেনে যে জিনগত ভাবে এই রোগটি ছড়ায় মাত্র ১%। কিন্তু স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যাক্তির ১ম মাত্রার আত্মীয় যেমনঃ বাবা,মা, ভাই, বোন তাদের এই রোগটি হয় ১০%। অর্থাৎ জিনগতভাবে যতটুকু ছড়ায় তার চেয়ে বেশি ছড়ায় পরিবেশের প্রভাবে।

তবে জিনগতভাবে এই রোগ কম ছড়ায় না। কারণ একজন মা যখন স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগী হয় এবং ‘জময’ বাচ্চার জন্ম দেয় তখন সেই জময বাচ্চাদের ক্ষেত্রে স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা ৬০-৬৫%।

কিছু জিন আছে যা আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন হরমোন সৃষ্টি করে। আর আমাদের মস্তিষ্কের হরমোন গুলো গঠন হওয়ার সময় জিনগুলো একত্রিত হয়ে সঠিকভাবে হরমোন তৈরী করতে না পারলেও এই রোগ হয়। 

তাছাড়া বিভিন্নভাবে মানসিক আঘাত পেলে, মাদক জাতীয় কিছু গ্রহণ করলে, ছোট বেলার কিছু ভয়ঙ্কর স্মৃতি এসব থেকেও স্কিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। তবে ছোট বেলার ভয়ংকর স্মৃতি থেকে স্কিজোফ্রেনিয়া হবার সম্ভাবনা বেশি।

কারণ আমরা পরিবেশ থেকে যেসব তথ্য পাই তা আমাদের মস্তিষ্কে সংরক্ষিত থাকে। আর ছোটবেলায় আমরা যখন বেশি ভয়ংকর কিছু দেখি তখন সেটা আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। কারণ ছোটবেলায় আমাদের মস্তিষ্ক বেশি মনে রাখতে পারে কারণ আমাদের স্মৃতি সংরক্ষণ অংশে অনেক জায়গা খালি থাকে এবং স্মৃতিগুলো একটা তরঙ্গের মাধ্যমে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। তারপর আমরা যখন বড় হতে থাকি আমাদের মস্তিষ্ক সব তথ্য বিশ্লেষণ করতে থাকে। (বিশেষ করে আমাদের ছোটবেলার স্মৃতি)।

বিশ্লেষণ করার সময় আমাদের মস্তিষ্ক ভয়ংকর স্মৃতি গুলোকে বেশি গুরত্ব দেয়। আর সেগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তখন (যে সময় বেশি ভয় পেয়েছিলেন) কী হতে পারত। আর মস্তিষ্ক এই পরীক্ষা করার সময় আমাদের অবচেতন মনে সংকেত পাঠায়। আর অবচেতন মন সেটা মানতে পারেনা। (কারণ অবচেতন মন সবসময় ভালো কোনো খবর চায়) তাই মানুষ বড় হবার সাথে সাথে অবচেতন মন ভয়ংকর স্মৃতির বিশ্লেষণ বের করে দিতে চায়। আর তখনই মানুষ অদ্ভুত সব জিনিস দেখতে শুরু করে।        

 

 

স্কিজোফ্রেনিয়ার প্রাথমিক কিছু লক্ষণ আছে। এই লক্ষণগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে যদি তাড়াতাড়ি চিকিৎসা করানো হয় তখন রোগটি আরোগ্য হলেও হতে পারে।

 

স্কিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণসমূহঃ

 

·         ঘন ঘন হ্যালুসিনেশনঃ  অর্থাৎ, স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী এমন কিছু দেখে বা শুনে যা অন্য কেউ শুনতে বা দেখতে পায়না এবং যার অস্তিত্ব বাস্তবে নেই। তবে হ্যালুসিনেশন সাধারণ কারণেও হতে পারে যেমন বিভিন্ন হাই পাওয়ারের অষুধ খেলে। অর্থাৎ, শুধু হ্যালুসিনেশন দেখে স্কিজোফ্রেনিয়া নির্ণয় করা যায়না। হ্যালুসিনেশন হওয়ার সময় যদি কন্ঠস্বর অদ্ভুত হয় এবং অদ্ভুত কোনো কিছুর অনুভূতি হয় তখন মোটামুটি ধরে নেওয়া যায় মানুষটি স্কিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছে। আবার শুধু কন্ঠস্বরের পরিবর্তন দেখেও মাঝে মাঝে স্কিজোফ্রেনিয়া নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। এমন যদি হয় নিজে নিজে সে কারো সাথে কথা বলছে এবং কথার সাথে অদ্ভুত আওয়াজ হচ্ছে এবং সে এমনভাব করছে যেন ওকে কেউ বিপদ সংকেত পাঠাচ্ছে বা কারো সঙ্গে কথা বলে প্রচন্ড রাগ করছে, পরিবারের সবার থেকে দূরে দূরে থাকছে তবে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মানুষটি স্কিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছে।

·         ডেল্যুশনঃ স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা বাস্তবে নেই বা মরে গেছে এমন সত্বাতেও বিশ্বাস করতে শুরু করে। তারা মনে করে অবাস্তব সত্ত্বা তাদের সাথে কথা বলতে চেষ্টা করছে। তারা মনে করে তাদের জগৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন। (মূলত এসব মস্তিষ্কের তৈরী)।

·         ট্যালিপ্যাথিক ও থট রিডিং ডেল্যুশনঃ সব স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী না পারলেও কিছু কিছু রোগী আছে যারা অন্যের মনের খবর পড়তে পারে এবং তারা  মনে করে অবাস্তব কোনো সত্ত্বা এসে তাদের বলে দেয় অন্য কোনো মানুষ কী ভাবছে। এবং সেগুলো সত্যিও হয়ে যায়। এগুলো আসলে ট্যালিপ্যাথিক যোগাযোগ বা থট রিডিং এর মাধ্যমে তারা বুঝতে পারে। কিন্তু তবুও তারা মনে করে যে কোনো আত্মা বা কোনো অবাস্তব সত্ত্বা এসে তাদেরকে বলে যায়। এবং তাদের ভুল ধারণা থেকে বের করে আনা যায় না।   

·         ভিন্ন ধরণের বা অবাস্তব চিন্তাঃ স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা কোনো বিষয়ে চিন্তা করতে গেলে অবাসতব চিন্তা করবে বা ভিন্ন ধরণের চিন্তা করবে। তাদের চিন্তাতেও স্কিজোফ্রেনিয়া প্রভাব ফেলে। স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগীরা চিন্তা রোগেও ভোগে। চিন্তা রোগের মধ্যে একটি হলো “Disorganized Thinking” বা বিশৃংখল চিন্তা। তাদের চিন্তা ভাবনা হয়ে থাকে জটিল এবং বিশৃংখল। (হয়তো বিশৃংখল না, তবে আমরা এই ধরণের চিন্তার সঙ্গে অপরিচিত)। তার কথা বলার সময় বিকৃত পথে কথা বলে যা আমাদের পক্ষে বোঝা কষ্টকর। তারা কথা বলার মাঝে থেমে যাবে। যদি জিজ্ঞাস করা হয় থামলে কেন? তখন বলবে আমার মনে হচ্ছে কেউ একজন আমার চিন্তা ধরে রেখেছে। একে বলা হয় “Thought Blocking”

·         ভিন্ন ধরণের চলাফেরাঃ  স্কিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত ব্যাক্তির চলাফেরা সাধারণ মানুষ থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন তারা কোনো কথা বলতে গেলে একটি কথা কয়েকবার করে উচ্চারণ করবে। আবার রাস্তাঘাটে হাঁটার সময় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়বে। আবার হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার করে উঠবে। তাদের কথা বার্তার কোনো ঠিক থাকেনা। তারা কোনো সামান্য সিদ্ধান্তও ঠিক করে নিতে পারেনা। কখন কী করা উচিৎ তাও মনে রাখতে পারেনা।  

·         ইনসোমোনিয়াঃ  স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যাক্তির রাতের বেলা ঘুম হয় না। তারা রাতের ঘুম দিনে ঘুমিয়ে নেয় এমনকি কাজের ফাঁকে ফাঁকে মুহূর্তের মধ্যেও এরা গভীর ঘুমে চলে যেতে পারে। আবার ঐ ঘুমে অদ্ভুত ধরনের স্বপ্ন দেখে।

·               অদ্ভুত কিছু করাঃ স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা সবসময় অদ্ভুত কিছু করে থাকে। তাদের সব কিছু হয় অদ্ভুত। যেমনঃ তারা কোনো গল্প বা কবিতা লিখছে যার কোনো অর্থ নাই বা হাস্যকর। তারা আবার মাঝেমধ্যে অদ্ভুত দার্শনিকের মতো কথা বলে। তারা মনে করে যে, তারা যা করে নিজে থেকে করেনা। সব কিছু করে অবাস্তব সত্ত্বা।

 

               


 

 

এসব লক্ষণ গুলোর কোনো একটি চোখে পড়লে রোগীকে মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।

 

চিকিৎসাঃ

 

স্কিজোফ্রেনিয়া রোগটি কয়দিন থাকবে সেটা জানা যায়না। তবে রোগের মাত্রা কতটুকু তা দেখে নির্ধারণ করা হয় চিকিৎসা কীরকম হবে।

এই রোগের মূল অষুধ হলো যুক্তিতর্ক। স্কিজোফ্রেনিয়া রোগীদের যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে যে তারা যেসব দেখছে, শুনছে সেগুলোর আসলে বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। সবই তার কল্পনা মাত্র।

কিন্তু যুক্তির মাধ্যমে খুব কম সংখ্যক লোকই স্কিজোফ্রেনিয়া থেকে সাধারণ জীবণে ফিরে আসতে পারে। আর যারা পারেনা তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা করাতে হয়। (সবার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার দরকার না হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরকম হয়।)

 

স্কিজোফ্রনিয়া একটি মারাত্মক রোগ। এটি মুহূর্তের মধ্যে একজন সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে দিতে পারে। তাই কারো যদি স্কিজোফ্রেনিয়ার কোনো একটি লক্ষণ দেখা তাহলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা করানো উচিৎ।