লেখক:

মীর তাফহীম মাহমুদ 

সপ্তম শ্রেণী 

লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় 

ব্লাক হোল কী?

ব্লাক হোল হলো মহাবিশ্বের এমন একটি বিন্দু যেখান থেকে কোনো কিছুই বের হয়ে আসতে পারেনা। এমনকি আলোও বের হয়ে আসতে পারেনা। যেকোনো পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ব্লাক হোল হলো একটি কালোর থেকেও কালো গোলক। ব্লাক হোলের প্রাণ হলো একটি বিন্দু সিঙ্গুলারিটি যা এর কেন্দ্রে অবস্থান করে। এটি ০ আয়তনের একটি বিন্দু কিন্তু এর ঘনত্ব হলো অসীম!!!!! হুম তুমি ঠিকই পড়েছ। শূন্য আয়তনে অসীম ঘনত্ব।

ব্লাক হোল হলো এমন একটি বস্তু, কোনো escape Velocity-ই এর থেকে পালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। একটি টেনিস বল চিন্তা করো। একে সোজা উপরে নিক্ষেপ করলে অভিকর্ষের কারণে এর বেগ আস্তে আস্তে কমে যাবে (হ্রাসমূলক ত্বরণ) এবং আবার নিচে পড়বে। কিন্তু আমরা যদি বলটিকে অনেক জোরে নিক্ষেপ করি (পৃথিবী থেকে 12km/s অথবা 26,843mph বেগে) তাহলে সেটি আর পৃথিবীতে ফিরে আসবেনা। পৃথিবী থেকে বড় কিছু যেমন, সূর্যের ক্ষেত্রে বলটিকে ছুড়তে হবে 618km/s অথবা 1,382,430mph এই বেগে। তাহলে সূর্যের কাছে আর বলটি ফিরে যাবেনা। আর উপরের উদাহরণ দুটি হলো পৃথিবী আর সূর্যের escape Velocity। অর্থাৎ, পালানোর বেগ।

 

যখন কোনো বস্তু মধ্যাকর্ষের আকর্ষণসীমার বাইরে থাকে তাহলে এর গতি শক্তি এবং বিভব শক্তি হবে । তাহলে আমরা যদি একে সমীকরণে বর্ণনা করি তবে পাবোঃ

1/2mv^2=GMm/r

আমরা যদি v এর জন্য পুনরায় সাজাতে যাই, তাহলে escape velocity পাবো:

Ve= 2GM/r..................(1)

যেখানে M হলো ঐ গ্রহ বা বস্তুর ভর, r হলো ব্যাসার্ধ। অর্থাৎ, escape velocity “m” এর উপর নির্ভর করেনা। 

 

ব্লাক হোলের গঠনঃ

স্বাভাবিকভাবে কোনো একটি নক্ষত্র চুপসে গেলে ব্লাক হোলে পরিণত হয়। তবে নক্ষত্রগুলোর ভর হয় অনেক। আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সূর্যের বিস্তৃতি প্রায় 1300000000km এবং এর ভর প্রায় 2000000000000000000000000000000kg অথবা 2×10^30kg এর কাছাকাছি। নক্ষত্রগুলোর অস্বাভাবিক ভরের জন্য এদের মধ্যাকর্ষণও অনেক। কেননা আমরা জানি মধ্যাকর্ষনের সাথে ভরের একটি অনন্য সম্পর্ক রয়েছে। কারণঃ

F=Gm1m2/r^2 …………(2)

 

এটি নিউটনের মধ্যাকর্ষন সূত্র। এখানে G এর মান ধ্রুবক। G= 6.67428×10^-11 যা খুব ছোট। যাই হোক, যখন তুমি m1m2 তে সূর্য এবং পৃথিবীর ভর রাখবে এবং r তাদের মধ্যবর্তী দুরত্ব হলে এদের মধ্যে আকর্ষন মান হবেঃ 3.76×10^22N ।

যখন নক্ষত্রের বাইরের তাপমাত্রার চাপে ভেতরের মধ্যাকর্ষন বাড়তে থাকে তখন, তখন সেই বলের কারণে নক্ষত্র চুপসে যেতে শুরু করে। সব ভর একটি বিন্দুতে পতিত হতে শুরু করে। এটি ধীরে ধীরে ছোট এবং অধিক ঘনত্বে আসতে শুরু করে। এবং এক সময় সমস্ত ভর একটি ছোট্ট বিন্দুতে ভিড় করে যার নাম সিঙ্গুলারিটি।  

 

সব চুপসে পড়া নক্ষত্রই কিন্তু ব্লাক হোলে পরিণত হয়না। ব্লাক হোল হবে কিনা তা নির্ভর করে তার ভরের উপর। যাই হোক, ব্লাক হোল হতে হলে নক্ষত্রকে বা বস্তুকে একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধে আসতে হবে। নিচে সমীকরণটি দেওয়া হলো যার সাহায্যে আমরা নির্ণয় করতে পারি ব্লাক হোল হতে হলে কোনো বস্তু বা নক্ষত্রের ব্যাসার্ধে আসা দরকারঃ

Rs=2GM/c^2 ………………………………(3)

যেখানে M বস্তু বা নক্ষত্রটির ভর। G মহাকর্ষিয় ধ্রুবক। C আলোর বেগ।  

 

এই ব্যাসার্ধ পরিমাপের সূত্রটির মান Schwarzschild radius, পদার্থবিজ্ঞানী Karl Schwarzschild এই সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন ১৯১৬ সালে। তাঁর নাম অনুসারে এর নাম রাখা হয়।

সূত্রটির উদাহরণঃ আমাদের পৃথিবীকে যদি এই সূত্র প্রয়োগ করে ব্লাক হোলে পরিণত করতে চাই তবে এর আয়তন ৮৭সে.মি. তে আনতে হবে। আর যদি সূর্যকে ব্লাক হোলে আনতে চাই তবে এর আয়তন হতে হবে ৩কি.মি.

 

Point of No Return:

যদি কোনো বস্তু শোয়ারশিল্ড ব্যাসার্ধ এর পরিমাপ অনুযায়ী সংকুচিত হওয়া শুরু করে তবে এই সংকুচিত হওয়ার কার্যক্রম চলতেই থাকবে যতক্ষন পর্যন্ত না এটি সিঙ্গুলারিটিতে পরিণত হয়। এই সিঙ্গুলারিটি থেকে একটি গোলক তৈরী হতে থাকবে যার নাম Event Horizon বা ঘটনা দিগন্ত। ঘটনা দিগন্তের মধ্যে সবকিছু এমনকি আলোও কেন্দ্রের দিকে যেতে থাকে। 


কোনো ব্যক্তি/বিজ্ঞানী যদি ঘটনা দিগন্তের মধ্য দিয়ে ব্লাক হোলে পতিত হতে থাকে তবে সে ভিন্ন কিছু দেখবে না। যদিও সে আকর্ষনের অসহ্য যন্ত্রনায় আচ্ছন্ন থাকবে।

 

ঘটনা দিগন্তের কাছাকাছি চরম মধ্যাকর্ষনের কারণে অদ্ভুত কিছু ঘটতে পারে। আমি বলেছিলাম, কেউ যদি ব্লাক হোলে পতিত হতে থাকে তবে সে অদ্ভুত বা ভিন্ন কিছুই দেখতে পাবেনা। কিন্তু যদি অন্য কেউ নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দেখে তবে সে অদ্ভুত জিনিস দেখতে পাবে। আমরা (শুধু আমাদের জন্য) যদি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দেখি কোনো ব্যক্তি ব্লাক হোলে পতিত হচ্ছে তবে আমরা দেখবো তার গতি ধীর হয়ে আসছে। আবার ঐ ব্যক্তি যদি ব্লাক হোল থেকে পালানোর চেষ্টা করে তবে দেখবো তার গতি আবার বেড়ে যাচ্ছে।      

আমরা বলতে পারিঃ

FM এবং F1/r^2 (২ নং সমীকরণ থেকে)

আমরা যদি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে বসে দেখি কোনো দূর্ভাগ্যবান ব্লাক হোলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তবে তার গতি কমে যাচ্ছে আবার যদি ফিরে আসতে চেষ্টা করে তবে তার গতি বেড়ে যাচ্ছে। এটা কি সত্যি? না। এটা সত্যি না। এটি শুধু আমাদের (নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে পর্যবেক্ষকের) জন্য সঠিক। মূলত, ব্লাক হোলের কাছে গেলে গতি বেড়ে যায় আবার দূরে গেলে গতি কমে যায়। আমাদের কাছে উল্টোটা দেখায় টাইম ডাইলেশনের জন্য। 

উত্তপ্ত ব্লাক হোল?

মহাশূন্যের ফাঁকা স্থানে কণা ও প্রতিকণা অবিরত উৎপন্ন হচ্ছে এবং ১সেকেন্ডেরও কম সময়ে প্রায় ১ মিলি সেকেন্ডেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সাধারণত এদেরকে বলা হয় থাকে Virtual Particle। এরা কোনো বস্তুর সাথে মিথস্ক্রিয়া করেনা এবং এদেরকে শনাক্ত করা যায়না। কিন্তু ১জোড়া ভার্চুয়াল পার্টিকেল যদি ঘটনা দিগন্তের কাছাকাছি উৎপন্ন হয় তবে এদের মধ্যে একটিকে ব্লাক হোল নিজের কাছে টেনে নেয় ধ্বংস হবার আগেই। 


 

বাকি যে কণা থাকে তাকে ব্লাক হোল নিজ দায়িত্বে ঘটনা দিগন্তের বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয়।  আর এটি স্বাধীন কণিকা হিসেবে মহাশূন্যে ঘুরে বেড়ায়।

যদি কোনো পর্যবেক্ষক নিরাপদ দূরত্ব থেকে পর্যবেক্ষণ করে তবে সে দেখবে ব্লাক হোল কণিকা বিকিরণ করছে এবং সাথে সাথে তাপমাত্রাও। এই তাপমাত্রা স্টিফেন হকিং বের করেছেনঃ

 

T= hc^3/8*pi*kGM.....................(4) (হকিং রেডিয়েশন)  

speed of light C, Plancks constant H, Gravitational Constant G, Boltzmanns constant k এবং ব্লাক হোলের ভর M । লক্ষ্য করোঃ এখানে প্লাংক কনষ্ট্যান্ট h এবং গ্র্যাভিটেশনাল কনষ্ট্যান্ট G আছে। অর্থাৎ, এটি Quantum-Gravity নির্দেশ করছে।

যদি আমাদের ব্লাক হোলের তাপমাত্রা জানা থাকে তবে আমরা Entropy বের করতে পারি।

S= kc^3A/4Gh..........................(5)

যেখানে A হলো ঘটনা দিগন্তের পৃষ্ঠের সীমানা।

 

ব্লাক হোল যেহেতু নিজ দায়িত্বে ভার্চুয়াল কণিকা বিকিরণ করে সেহেতু এটি ভর হারায় এবং ছোট হতে থাকে। 4 নং সমীকরণ থেকে আমরা দখতে পাই, ব্লাক হোলের ভর যত কমবে তাপমাত্রা তত বাড়বে। সুতরাং, ব্লাক হোলের হকিং বিকিরণের কারনে এটি সংকুচিত হতে থাকে এবং উত্তপ্ত হতে থাকে। অর্থাৎ, যত বেশি বিকিরণ হবে তাপমাত্রা তত বেশি বাড়তে থাকবে। এরকম চলতেই থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্লাক হোলের ভর ০ হয়। তারপর কী হবে?

সূর্য্যের ভরের ৫ গুণ বড় ব্লাক হোলের তাপমাত্রা হবে প্রায় 12X10^-9 Kelvin, মহাশূন্যের তাপমাত্রা প্রায় 2.7K যা অনেক বেশি। তাপগতি-বিজ্ঞানের ২য় সূত্রানুসারে, মহাশূন্যের তাপমাত্রা ব্লাক হোলের শক্তির যোগান দেবে। এই তাপশক্তি ব্লাক হোলের সঙ্গে আরো ভর যুক্ত করবে E=mc^2 অনুযায়ী। যার ফলে ব্লাক হোল আবার বড় হতে থাকবে এবং ঠান্ডা হতে থাকবে।

ব্লাক হোলের বাষ্পীভবন দেখতে হলে এমন একটি ব্লাক হোল লাগবে যার তাপমাত্রা হবে মহাশূন্যের তাপমত্রা থেকে আরো বেশি।

তুমি যদি উদ্যেগ নিয়ে থাকো, তোমার গাড়ি তুমি ব্লাক হোলে পরিণত করবে তবে তাহলে একে প্রায় 1X10^-24m এ আনতে হবে কিন্তু এটি 1X10^-9s এ বাষ্পীভূত হয়ে যাবে।

ব্লাক হোল সম্পর্কিত প্রশ্ন উত্তর

ব্লাক হোল সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন উত্তর ব্লাক হোলের ঘনত্ব কতটুকু?

সাধারণ আপেক্ষিকতা একটি ভবিষ্যদ্বানী করে যেখানে বলা আছে, কোনো একটি বস্তু যদি ব্লাক হোলের মধ্যে পতিত হয় তবে সেটি অসীম ঘনত্বের একটি বিন্দুতে পৌঁছাবে। আমাদের প্রিয় আপেক্ষিক তত্ত্বের সূত্র এখানে এসে ভেঙ্গে যায়। :3 কেউই যানতে পারেনা ব্লাক হোলের ভেতর কী চলছে। ব্লাক হোলের ভেতরে কী চলছে তা ব্যাখ্যা করতে হলে আমাদের একটি টেকসই কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির তত্ত্ব অনুসরণ করতে হবে।

আমরা সাধারণভাবে যখন ব্লাক হোলের সাইজ সম্পর্কে কথা বলতে যাই তখন আমরা Schwarzschild radius (শোয়ারশিল্ড ব্যাসার্ধ) এর ব্যবহার করি। শোয়ারশিল্ড ব্যাসার্ধ হলো কোনো এক প্রত্যাবর্তন বিন্দু। কখনো তুমি যদি ব্লাক হোলের পাশাপাশি যাও তাহলে তুমি সেখান পতিত হবে কিন্তু তুমি কখনো সেখান থেকে বেরুতে পারবেনা।

এর ফলে, শোয়ারশিল্ড ব্যাসার্ধের escape speed হলো আলোর গতির সমান। আর এই শোয়ারশিল্ড ব্যাসার্ধের মান হবে প্রায় (3X10^5 cm) X (M/Msun) যেখানে M হলো ব্লাক হোলের ভর  Msun হলো সূর্যের ভর।

সাধারণত আমাদের গ্যালাক্সির আশেপাশের সাধারণ ব্লাক হোলগুলোর ভর তথা M এর মান সূর্যের ১০ গুণ হয়ে থাকে। কিন্তু সুপারম্যাসিভ ব্লাক হোলের ক্ষেত্রে (সকল গ্যালাক্সির কেন্দ্রের ব্লাক হোল) এই M এর মান সূর্যের থেকে মিলিওন এমনকি বিলিওন গুন বেশি হতে পারে।

ব্লাক হোল আর পরমাণুর মধ্যে কিছু দুরন্ত সাদৃশ্য রয়েছে। উভয়ক্ষেত্রেই এদের ভর থাকে কেন্দ্রে, কিন্তু তাদের আকার বেশ বড় হয়।

যাইহোক, তুমি শোয়ারশিল্ড ব্যাসার্ধ দিয়ে যেকোনো ব্লাকহোলের ঘনত্ব মাপতে পারো।

(বিঃদ্রঃ শোয়ারশিল্ড ব্যাসার্ধের ক্ষেত্রে ভরকে আয়তন দ্বারা ভাগ করা হয়)

এর মান প্রায় (1.8x10^16g/cm^3) x (Msun / M)^2   এর সমান হবে। (যেখানে M উপরে বর্ণনা করা হয়েছে)। বাইরের পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ব্লাকহোলের প্রকৃত ঘনত্ব বলে মনে হবে। এই ক্ষেত্রে বাইরের পর্যবেক্ষকের উপর কোনো প্রভাব পড়বেনা।         

ব্লাক হোলের সিঙ্গুলারিটি কি নতুন মহাবিশ্ব তৈরী করে?

না। একটি সিঙ্গুলারিটি বাস্তব অপেক্ষা গাণিতিক ধারণার উপরই বেশি নির্ভর করে। এটা সত্যি যে গাণিতিক ভাবে বর্ণনা করা যায় যে ব্লাক হোল এবং বিগ ব্যাং দুটোই সিঙ্গুলারিটি ধারণ করে। কিন্তু তারা সম্পর্কিত নয়। ব্লাক হোল হলো আমাদের সূর্যি মামা অপেক্ষা মাত্র কিছু গুণ বা অনেক গুণ ভারি বস্তু যা আমাদের মহাবিশ্বেই অবস্থান করে। কিন্তু, মহাবিশ্ব তৈরী হতে হলে এর ভর হতে হবে অসীম। অর্থাৎ, ব্লাক হোলের সিঙ্গুলারিটি কখনোই অন্য মহাবিশ্বের জন্ম দিতে পারেনা।

আলোর যদি ভর নাই বা থাকে তবে ব্লাক হোল হইতে ইহা পালাইতে অক্ষম কেন?

এই প্রশ্ন হলো ব্লাক হোল সম্পর্কিত সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন, এমনকি আলো সম্পর্কেও এই প্রশ্নটিই বেশি আলোচিত।

ফোটনের (যে কণাগুলো দিয়ে আলো গঠিত হয়) ভর হলো শূন্য। অর্থাৎ, ফোটনের কোনো ভর নাই। যদি ফোটনের ভরই নেই তাহলে এটি ব্লাক হোল দ্বারা আকর্ষিত হয় কীভাবে?

তোমাকে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে সাধারণ আপেক্ষিকতা সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকতে হবে। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব বলে, যে কোনো বস্তুই এর চারপাশে থাকা স্পেসটাইমের দেয়ালকে বাঁকিয়ে দেয়। একটি রাবারের শিট কল্পনা করো। এই রাবারের শিটে এখন যদি তুমি একটি খুব ভারি একটা বল রাখো তাহলে এটি রাবারের শিটটিকে বাঁকিয়ে দিবে। বাস্তবেও স্পেসে এমনই ঘটে।     

তাছাড়া, ফোটন সবসময় দুটো বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে নিকটবর্তী দূরত্ত্বে চলাচল করে। যেহেতু, স্পেস টাইম বেঁকে যায় সেহেতু আলো যখন ব্লাক হোলের সীমানার কাছাকাছি চলে আসলে সেটি ব্লাক হোলে পতিত হয়। কারণ আলো আর সরল পথে যাওয়ার জন্য রাস্তা পায় না।

বাস্তব অর্থে আমরা কিন্তু বলতে পারিনা যে ব্লাক হোল আলোকে আকর্ষণ করে। বরং আমরা এটা বলতে পারি যে আলোই ব্লাক হোলের সীমানা দিয়ে যাওয়ার সময় ব্লাক হোলে পতিত হয়।

একটি ব্লাক হোলের চারপাশে স্থান কাল খুব বেশি বেঁকে যায়। তাই ব্লাক হোল থেকে আলো বেরুতে পারেনা।

যদি বিগ ব্যাং এর পূর্বে পুরো মহাবিশ্বই একটা বিন্দুতে থাকে তবে তখন সময় থেমে থাকেনি কেন?

প্রশ্নটা আরেকটু সহজ করে বলিঃ যদি সময় ব্লাক হোলের কাছাকাছি স্থির হয়ে আসে তবে বিগ ব্যং এর পূর্ব মুহূর্তে যখন সমগ্র মহাবিশ্ব একটি বিন্দুতে কেন্দ্রিভূত ছিল তখন সময় তো স্থির থাকার কথা। তাহলে সময় শুরু হলো কীভাবে?

আসলে এটা বলা ঠিক হবেনা যে ব্লাক হোলের কাছে গিয়ে সময় স্থির হয়ে যায়। এক্ষেত্রে বাস্তবতা আরো সূক্ষ। J ধরো, তুমি এবং তোমার বন্ধু দুজনই ব্লাক হোলের মধ্যে কথোপকথোন করছো। তোমাদের কাছে সময় কিন্তু স্বাভাবিকই থাকবে। কিন্তু তোমাদের কেউ একজন যদি ব্লাক হোলে থাকো এবং অন্য একজন যদি ব্লাক হোলের বাইরে থাকো শুধু তখনই তোমাদের মধ্যে Time Dilation হবে। অর্থাৎ, তোমরা দুইজন একই জায়গায় থাকলে তোমাদের সময় স্বাভাবিকই থাকবে কিন্তু একজন যদি দুজন যদি ভিন্ন স্থানে থাকো তাহলে আর তোমাদের সময় স্বাভাবিক থাকবেনা। সেখানে তৈরী হবে টাইম ডাইলেশন। যে ব্লাক হোলের মধ্যে থাকবে তার কাছে আমাদের স্বাভাবিক ১সেকেন্ডকে মনে হবে অসীম সময়!!! যেমনটা হয়, অদ্ভুত স্থানাংক দিয়ে হোয়াইট হোল প্রমাণ করার সময়।

তাই যদিও মহাবিশ্বের শুরুর দিকে সবকিছু খুব ঘনত্বের একটি বিন্দুতে ছিল, তখন সব বস্তুগুলোর ক্ষেত্রেও সময় ঠিক সেভাবেই স্বাভাবিক ছিল যেমনটা আমি উপরে ব্লাক হোলের উদাহরণ দিয়েছে। সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়েই একই ঘনত্ব ছিল। তাই মহাবিশ্বের সব অংশেই সময় স্বাভাবিক ভাবেই প্রবাহিত হতো (সিঙ্গুলারিটিতে)। অর্থাৎ, সেখানে সময় কখনোই স্থির ছিলনা। তাই যারা ভাবছেন বিগ ব্যাং এর পূর্বে সময় স্থির ছিল আপনাদের ধারণা পালটে ফেলুন। কারণ, সেখানে কোনো বাইরের পর্যবেক্ষক ছিলনা।

ব্লাক হোলের সাইজ কতটুকু?

তুমি যদি ব্লাক হোল সম্পর্কে কোনো বই পড়ে থাকো তাহলে অবশ্যই তুমি ঘটনা দিগন্ত নামটা কয়েকবার পেয়েছ। এটাই হলো সেই বিন্দু যেখান থেকে আলো পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারেনা। :O কেউই জানেনা ব্লাক হোলের ঘটনা দিগন্তের অভ্যন্তরে আসলে কী হয়। আমাদের ঘটনা দিগন্তকে ব্যাখ্যা করতে হলে Quantum Gravity সাহায্য নিতে হবে। ক্লাসিক্যাল থিওরি অনুযায়ীঃ সকল ভর সিঙ্গুলারিটি নামক একটি বিন্দুতে চুপসে পড়ে। আমরা এটা তাত্ত্বিক ভাবেই জানি। কিন্তু আসলে কী হয় সেটা কিন্তু জানিনা।

যখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্লাক হোলের আয়তনের প্রসঙ্গ তোলেন তখন তারা অবশ্যই ঘটনা দিগন্ত এর প্রসঙ্গ তোলেন। ঘটনা দিগন্ত ব্লাক হোলের থেকে দূরত্ব নির্দেশ করে যেখানে escape velocity = velocity of light. (এতটুকু না বুঝলে নিচে ব্যাখ্যা আছে)  অন্য কথায় কোনো বস্তুকণাই এমনকি আলোও ব্লাক হোলের ঘটোনা দিগন্ত অতিক্রম করতে পারেনা।

গাণিতিকভাবে, ব্লাক হোলের আকৃতি হলো (GM/c^2) যেখানে G হলো মহাকর্ষীয় ধ্রুবক, M হলো ব্লাক হোলের ভর, c হলো আলোর বেগ। অর্থাৎ আমরা যখন বলি ওমুক ব্লাক হোলের আয়তন হলো ৫ কি.মি. তখন আসলে আমরা বুঝাই ব্লাক হোলের কেন্দ্র থেকে ঘটনা দিগন্তের বিস্তৃতি ৫ কি.মি. আমরা সূর্যকে যদি ব্লাক হোলে পরিণত করতে চাই তাহলে এর আয়তন হতে হবে ৩ কি.মি. আর পৃথিবীকে যদি আমরা চেপেচুপে ৮৭ সে.মি. আয়তনে আনতে পারি তবে পৃথিবীও ক্ষুদে ব্লাক হোলে পরিণত হবে।

ব্লাক হোলের কাছাকাছি সময় ধীর হতে থাকে কেন?

ব্লাক হোলের ক্ষেত্রে আপেক্ষিক তত্ত্বের কিছু ধারণা মেনে নেওয়া লাগে। এদের মধ্যে একটি হলো স্পেস-টাইম। স্পেস-টাইমের অবকাঠামো থেকে আমরা ধারণা করতে পারি যে কোনো বস্তুই স্পেসটাইমের বক্রতা সৃষ্টি করে। কোনো বস্তুর ভর যত বেশি হবে তার বক্রতাও তত বৃদ্ধি পাবে।

আমরা জানি, ব্লাক হোলের ভর অনেক হয় আর ঘনত্ব হয় অসীম। আপেক্ষিকতার একটি নীতি থেকে পাইঃ অত্যাধিক মহাকর্ষের ফলে স্থান কালও অত্যাধিক বেঁকে যায়। ব্লাক হোলের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটে। ব্লাক হোলের মহাকর্ষ এতই বেশি যে সেটা স্পেসটাইমকে এমনভাবে বাঁকিয়ে দেয় যেখানে সময়ের প্রবাহ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। একে বলে Gravitational Time Dilation. :) অর্থাৎ, অত্যাধিক মহাকর্ষের কারণে টাইম ডাইলেশন সৃষ্টি হয়।

তাই ব্লাক হোলের কাছাকাছি সময় ধীর হতে থাকে।


এমন কোনো সম্ভাবনা আছে যে আমাদের সৌরজগৎ অথবা পুরো মহাবিশ্বই কোনো একটি ব্লাক হোলের ভেতর রয়েছে?

আমাদের মহাবিশ্বে সময় সবসময় সামনের দিকেই চলে। কেউ দেখেনি সময়কে পেছনে যেতে। পক্ষান্তরে, ব্লাক হোলের ঘটনা দিগন্তের মধ্যে স্পেস-টাইমের আচরণ হয় একেবারে উল্টো। অর্থাৎ, স্পেস সবসময় কেন্দ্রের দিকে যায়। যদি তুমি ব্লাক হোলের সামনে অথবা পেছনে যাও, তুমি সেই সিঙ্গুলারিটি অর্থৎ, কেন্দ্রের দিকেই যেতে থাকবে। আমাদের মহাবিশ্বও কি একই রকম? না। আমাদের মহাবিশ্ব সেরকম নয়। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি আমাদের মহাবিশ্ব ব্লাক হোলের ভেতর নেই।

হোয়াইট হোল

হোয়াইট হোল এমন একটি বস্তু যা পদার্থবিজ্ঞানের কিছু তত্ত্বে দেখা যায়। কেউই এটা এখনো দেখেনি। যখন একটি ব্লাক হোল নিষ্পন্ন হয় তখন সব কিছু এর মধ্যে এসে পতিত হয়। আর যেসব বস্তু ব্লাক হোলে পতিত হয় সেগুলোকে কোনো একখানে যেতে হয়। হোয়াইট হোলের ধারণা এভাবেই আসে। যে বস্তুগুলো ব্লাক হোলে পতিত হয় সেগুলো কোথায় যায়? হয় সেগুলো আমাদের মহাবিশ্বে নাহয় অন্য কোনোভাবে অন্য কোনো মহাবিশ্বে। কিন্তু তার সম্ভাবনা একেবারেই কম। কারণ অন্য মহাবিশ্বে যাওয়ার পক্ষে কোনো যুক্তিই নেই। তাই ধারণা করা হয় বস্তুগুলো বের হতে হলে এমন মাধ্যম দরকার যা সবকিছু বের করে দেয়। আর এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় হোয়াইট হোলের।

বিজ্ঞানীদের ধারণা যতটুকু পজেটিভ গ্রাভিটির চাপে ব্লাক হোল সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে এবং সব কিছুকে নিজের করে নিচ্ছে ঠিক তেমনি করে হোয়াইট হোল নেগেটিভ গ্রাভিটির চাপে হোয়াইট হোল সবকিছু বের করে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন ব্লাক হোলের কোয়াসার গুলো হতে পারে হোয়াইট হোল। সব কিছু যেহেতু বের করে দেয় তাই একে সাদা দেখা যায়। তাহলে এটিই হলো হোয়াইট হোল।

এসময় এটি একটি ধারণা মাত্র। এটা ঠিক নাও হতে পারে। আবার ঠিক হতেও পারে। ঠিক নাও হতে পারি বলছি কারণ স্টিফেন হকিং- হকিং রেডিয়েশন নামক এক তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন যাতে বলা হয়েছে ব্লাক হোলে কোনো বস্তু পতিত হলে তা হতে শক্তিও নির্গত হয়। অর্থাৎ, ব্লাক হোল বড় হবেনা। কিন্তু এতে বলা আছে ব্লাক হোল ধ্বংস হবে। তবে বহু শতাব্দি লাগবে ধ্বংস হতে।

বিভ্রান্তময়ী হোয়াইট হোলঃ

বিভ্রান্তময়ী হোয়াইট হোল দেখে মনে হচ্ছে এই অংশ আবার কেন? উপরে তো বলেই দেওয়া হয়েছে হোয়াইট হোল সত্যও হতে পারে আবার মিথ্যাও।  

যাই হোক কথা না ঘুরিয়ে হোয়াইট হোলের বিভ্রান্তময়ী ধারণায় যাই।

অদ্ভুত স্থানাংকিত ব্লাক অ্যান্ড হোয়াইট গর্তঃ

তুমি যদি হোয়াইট হোলকে ভাবো বিগ ব্যাং তাহলে সঠিক হলেও হতে পারো। কিন্তু ব্লাক হোলের বিপরীত ভাবলে তা কখনোই বাস্তব হতেই পারেনা।

আমরা শুধু তখনই হোয়াইট হোলকে ব্লাক হোলে দেখতে পাবো যখন আমরা কিছু অদ্ভুত স্থানাংকের সামনে ব্লাক হোলকে ব্যাখ্যা করবো। তাই তারা শুধু অবাস্তব গাণিতিক হস্তনির্মিত বস্তু।

তবে আমি বলতে চাচ্ছিনা হোয়াইট হোল তত্ত্বকে আমরা ফেলে দিতে পারি। বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে অনেক তর্ক করছেন। সুতরাং আমাদের তর্ক না করাই ভালো।

যাইহোক, তোমার পক্ষে এখন হোয়াইট হোল দেখার সম্ভাবনা মোটামুটি নেই বললেই চলে। কারণ অদ্ভুত স্থানাংক অনুসারে ইহা সত্য হইলেও সাধারণ স্থানাংক অনুসারে ইহা মোটেই সত্য নয়। ইহা নাকি একবারই দেখা গিয়েছিল সেই বিগ ব্যাং এর সময়। যদিও দেখা যায়নি, তবুও তৈরী তো হয়েছিল!!! 


(ডায়াগ্রামঃ স্পেস-টাইম ব্লাক হোলের ভেতরে পুঞ্জিভুত হয়ে যায়। একে সহজ করে তোলার জন্যই এই Kruskal-Szekeres স্থানাংকটি সৃষ্টি হয়েছে)  

চিত্রটিতে দুটি সরল রেখা কেন্দ্র দিয়ে যাচ্ছে সেগুলো হলো সময়ের Constant Line। ব্লাক হোলের ঘটনা দিগন্তও অসীম দূরে।(বাহির দৃষ্টিকোণ হইতে ইহা চিরকালের জন্য)। ব্লাক হোলের অভ্যন্তর হলো উপরের ত্রিভুজ, সমগ্র মহাবিশ্বের অধিকার ত্রিভুজীয় অঞ্চলে, আর হোয়াইট হোল হলো নিচের এলাকা।    

 

নিচের অঞ্চলের সীমানা অসীম অতীতে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, ব্লাক হোলের এই নির্বোধ স্থানাংক আদর্শায়ন করলেও আমরা দেখতে পাবো হোয়াইট হোল হলো ব্লাক হোল থেকে অসীম অতীতে। এখানে একটা বিষয়ঃ ব্লাক হোলকে কি সসীম অতীতে নিষ্পন্ন হতে হয়?

 

এই মডেল সম্পূর্ণ গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করলে আমরা কিছুটা বুঝতে পারি হোয়াইট হোল থাকলেও থাকতে পারে ব্লাক হোল থেকে অসীম অতীতে। তবে সিউর নই। তবে বলা যায়, এটি অন্যান্য জিনিস সম্পর্কে চিন্তা করতে বা গভীর কল্পনা করতে ব্যবহৃত একটি বিমূর্ততা

 

আমরা এখন অদ্ভুত স্থানাংকটি ছাড়া হোয়াইট হোল চিন্তা করতে পারিনা। এখন আমাদের মনে হতে পারে হোয়াইট হোল হলো সম্পূর্ণ বানোয়াট আর গাঁজাখুরি গল্প। কিন্তু আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে কিছুই বলতে পারিনা। কেননা বিজ্ঞানীরা বহু বিতর্কে আছেন এই হোয়াইট হোল নিয়ে। তাই আমরা কিন্তু কিছু বলতে পারবোনা যতক্ষণ পর্যন্ত না আরো কোনো যুক্তিযুক্ত থিওরি দাঁড় করানো হয়।