লেখক:


Showsan kabir maisha 

Class 9,
B A F Shaheen College Kurmitola.



কিছু মানুষ সবসময় মিথ্যা বলে। কিন্ত সাধারণ মানুষের জন্য অর্থাৎ যারা বাধ্য হয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলে তাদের কাছে মিথ্যা বলা একটি অপরাধমূলক কাজ। University of Massachusetts এর গবেষক রবার্ট ফোল্ডম্যান মানুষ কীভাবে এবং কেন মিথ্যা বলে তা বুঝার জন্য একটি গবেষণা চালায়। রবার্ট এবং তার গবেষক দল দুইজন অপরিচিত মানুষকে ১০ মিনিটের জন্য নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য দেওয়া হয় আর সেই কথাবার্তা রেকর্ড করা হয়। তারপর দুইজনকেই জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, তারা তাদের কথাবার্তায় কতটা সৎ ছিল? তখন তারা বলে তারা সব সত্যি কথা বলেছে। কিন্তু যখন তাদেরকে রেকর্ডিংটা শোনানো হয় তারা অবাক হয়ে যায় কারণ তারা শুধু ১০ মিনিট কথাবার্তার মধ্যেই ছোট ছোট কিছু মিথ্যা কথা বলেছে। ফোল্ডম্যানের মতে, ৬০ শতাংশ মানুষ অন্তত একবার মিথ্যা বলে অল্প আলাপের মধ্যেই। আর ঐ দুজন মানুষ যাদের কথা বলতে দেয়া হয়েছিল তারা প্রায় ২.৯২ শতাংশ মিথ্যা বলেছে মাত্র ১০ মিনিটের আলাপে তাও আবার একজন অপরিচিত মানুষের সাথে।

কিন্ত মানুষ মিথ্যা বলে কেন? 

মানুষ অনেক কারণে মিথ্যা বলে। অন্যের সম্মান পাওয়ার জন্য, কাউকে ছোট করার জন্য, নিজের অক্ষমতাকে লুকানোর জন্য, নিজের দুর্বলতাকে লুকানোর জন্য, ব্যাক্তিগত বিষয় লুকিয়ে রাখার জন্য, কারও কোন বিশ্বাস বজায় রাখার জন্য, নিজের ব্যর্থতাকে লুকানোর জন্য, কোন সম্পর্কের ভাল ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে মিথ্যা বলার বড় বড় কারনের মধ্যে পড়ে শাস্তি থেকে বাঁচা এবং প্রতারনা করা। আসলে মিথ্যা বলার কারণের কোন অভাবই নেই। এরকম হাজার হাজার কারণ দেয়া যায়।      


এখন জানা যাক মানুষ মিথ্যা বলা শুরু করে কখন থেকে? 

সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ ২ থেকে ৩ বছর বয়সে মিথ্যা বলা শুরু করে। কিন্তু সেই সময় তাদের মিথ্যা বলার পরিধিটা থাকে ছোট। তখন তাদের মিথ্যা বলার কারণ থাকে শাস্তি থেকে বাঁচা।  বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর পরিধিও বাড়তে থাকে। তখন মানুষ মিথ্যা বলে সাধারণত দুটি উদ্দেশ্যে। একটি হল ভাল উদ্দেশ্যে যেমন, কারও অনুভুতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর জন্য অথবা কোন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য মানুষ মিথ্যা বলে। অন্যদিকে প্রতারনার জন্য বলা মিথ্যার উদ্দেশ্য খুব একটা খাঁটি হয় না।

মিথ্যা বলা এক ধরনের psychological disorder

আবার আমাদের সমাজে এমন মানুষ আছে যারা কারণে অকারণে মিথ্যা বলে। এ ধরনের মিথ্যাবাদীরা বেশীরভাগ সময় যে তারা মিথ্যা বলছে এটা বুঝতেই পারে না। সেসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বলাকে মনোবিজ্ঞানীরা এবং  স্নায়ুবিজ্ঞানীরা psychological disorder  হিসেবেই ধরে নেন। মিথ্যা বলার কিছু উল্লেখযোগ্য disorder হল- 

১.  Antisocial personality disorder

 

২.Narcissistic personality disorder

  

৩.Obsessive-compulsive disorder                                            

     

মিথ্যা সনাক্তকারী প্রযুক্তি

 বিজ্ঞানীরা মানুষ কীভাবে মিথ্যা বলে তা বোঝার চেষ্টা করছেন। এটা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা কিছু পরীক্ষা করেন। মিথ্যা বলার সময় মানুষের মস্তিষ্কের কার্যাবলী দেখার জন্য কিছু মানুষের মাথায় কয়েকটি ইলেকট্রড লাগানো হয় এবং সেই ভলান্টিয়ারদের কিছু নির্ধারিত অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে দেওয়া হয়। তারপর তাদেরকে কিছু সত্য আর কিছু মিথ্যা বলতে বলা হয়। এভাবেই মিথ্যা বলার সময় মানুষের মস্তিষ্কের উপর অংশের পরিবর্তনগুলো দেখা হয়। তবে এই পরীক্ষাটি খুব একটা ভাল ফলাফল আসে না। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা অভিনব এক প্রযুক্তি বের করেছেন। fMRI (functioning magnetic resonance imaging) প্রযুক্তি এবং polygraph tests। এই প্রযুক্তিগুলো মিথ্যা বলা সনাক্ত করা হয় মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন, চেহারার পরিবর্তন, শ্বাস প্রশ্বাসের গতি উঠানামা ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এটা বোঝা গেছে যে, মানুষ যখন মিথ্যা বলে তখন তাদের অগ্রমস্তিষ্কের কার্যাবলি বৃদ্ধি পায়। আর যারা সবসময় মিথ্যা বলে না তাদের চেহারায় বাহ্যিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো সাধারন মানুষের চোখে সহজে ধরা পরে না যদি না তারা সেই পরিবর্তনের সাথে পরিচিত হয়।    

মিথ্যা সনাক্তকরার এই পদ্ধতি গুলো কতটা কার্যকর ?

বর্তমানে মিথ্যা সনাক্তকরনে যেসব প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় সেসব প্রযুক্তি এখন পর্যন্ত বিতর্কিত। কারন এই পদ্ধতিগুলোর কার্যকারীতা পরীক্ষা করা হয় ল্যাবরেটরিতে। যেখানে কিছু অবস্থা সৃষ্টি করা হয় এবং ভলান্টিয়ারদের বলাই হয় যে ঐ অবস্থায় মিথ্যা বলার জন্য। তবে ল্যাবে বলা মিথ্যার সাথে কোন আবেগীয় ব্যাপার কখনই জড়িত থাকে না। ল্যাবরেটরিতে ভলান্টিয়াররা গড়ে ১৫% মিথ্যা বলে ৮৫% সত্যতার সাথে তাদের সম্প্রতি করা কয়েকটি কাজের উপর ভিত্তি করে। fMRI অগ্র মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহের মাত্রার উপর নির্ভর করে মিথ্যা নির্নয় করা হয় কারন বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে মিথ্যা বলার সময় অগ্র মস্তিষ্ক বেশী কাজ করে। আর polygraph tests রক্তচাপ, চেহারার পরিবর্তন, শ্বাস প্রশ্বাসের গতির পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ের উপর হিসাব করে মিথ্যা নির্নয় করে।

তবে আসল জীবনে মানুষ সূক্ষ মিথ্যা বলে, অনেক বড় মিথ্যা পর্যন্ত বলে যেখানের ৯০% মিথ্যা বলে। বাস্তব জীবনে যেসব মিথ্যা বলে সেগুলো সবসময় হয় নিজের মাধ্যমে এবং বলা কথাটা সম্প্রতি কোন ঘটনার উপর নাও হতে পারে এবং বেশিরভাগ সময় খুব ঝুঁকি নিয়ে কথা গুলো বলে যার সাথে অনেক আবেগীয় ব্যাপার ও জড়িত থাকে। । আবার অনেক মিথ্যা পরিকল্পনা করে খুব ঠান্ডা মাথায় বলা। বিশেষ করে পেশাদার অপরাধীদের ক্ষেত্রে। তারা খুব সুন্দর করে এমন কিছু মিথ্যা বলবে যা বলার সময় তাদের মস্তিষ্কে খুব একটা আন্দোলন দেখা যায় না। আর যেহেতু স্নায়ুর উপর চাপ ছাড়া মিথ্যা বলে তাই তাদের রক্তচাপ এবং শ্বাস প্রশ্বাসের গতি সবই  কিন্তু স্বাভাবিক থাকে। তাই এই  fMRI  এবং  polygraph tests যদিও বা কিছুটা মিথ্যা সনাক্ত করতে পারে তবুও এই পদ্ধতিগুলো এখন ও পুরোপুরি কাজ করে না।

মিথ্যা টিকে থাকার জন্য প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত বৈশিষ্ট্য   

মিথ্যা বলাটা এক ধরনের প্রতারনা ও বলা যায়। মানুষের এই উন্নত মস্তিষ্ক কয়েক মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ফসল। এই মস্তিষ্ক ৩ টি মস্তিষ্কের সম্বন্বয়ে তৈরী। সরীসৃপীয় মস্তিষ্ক, স্তন্যপায়ী মস্তিষ্ক এবং নতুন উন্নত মস্তিষ্ক। যার কারনে সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ীদের কিছু বৈশিষ্ট্য ও মানুষের মধ্যে চলে এসেছে। প্রকৃতিতে অনেক প্রানীদের মধ্যেই প্রতারনা করার বিষয়টি দেখা যায়, কিছু প্রানী নিজের আত্মরক্ষার  জন্য ব্যবহার করে আর কিছু প্রানী তাদের খাবারদেরকে ফাঁদে ফেলবার জন্য ব্যবহার করে। এই রিফ্লেক্স গুলো এসব প্রানীদের মধ্যে বিবর্তনের মাধ্যমে এসেছে কারন এই রিফ্লেক্সের কারনেই এই প্রানীগুলো টিকে আছে। ঠিক তেমনি মানুষের মধ্যেও বির্বতনের মাধ্যমেই প্রতারনা ব্যাপারটা এসে গেছে কারন এই প্রতারনাও মানুষকে টিকে থাকার কোন না কোন দিক দিয়ে যোগ্যতম করে তুলেছে যার কারনে এই বৈশিষ্ট্যটি প্রাকৃতি কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছে। আর এই প্রতারনার একটি আধুনিক রূপ হল মিথ্যা বলা। তাই মিথ্যা বলার ব্যপারটিকে জেনেটিক ও বলা যায়। তবে অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মত এই বৈশিষ্ট্যটি প্রকাশ তখনই পায় যখন উপযুক্ত পরিবেশ থাকে অর্থাৎ একটা শিশু যখন তার আশেপাশের মানুষদের মধ্যে এই মিথ্যা বলার ব্যাপারটি দেখবে তখনই কেবল তার মধ্যে মিথ্যা বলার প্রবনতা দেখা দিবে।      

 কিন্তু যাই বলা হোক না কেন মিথ্যা বলা প্রতিটা মানুষেরই চরিত্রেরই একটা অংশ। সবাই কিন্তু মিথ্যা কথা বলে কেউ কম কেউ বেশি। কেউ ভাল উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলে আর কেউ বলে খারাপ উদ্দেশ্যে এটাই হল মূল পার্থক্য ভাল এবং খারাপ মানুষদের। 


Reference

1.      Abe N. The neurobiology of deception: evidence from neuroimaging and loss of function studies. Current Opinion in Neurology. Dec; 22(6):594-600 (2009).

2.      Christ SE, Van Essen DC, Watson JM, Brubaker LE, McDermott KB. The contributions of prefrontal cortex and executive control to deception: evidence from activation likelihood estimate meta-analyses. Cerebral Cortex. Jul; 19(7):1557-66 (2009).

3.      Ganis G, Rosenfeld JP, Meixner J, Kievit RA, Schendan HE. Lying in the scanner: covert countermeasures disrupt deception detection by functional magnetic resonance imaging. Neuroimage. Mar;55(1):312-319 (2011).

4.      Wagner A. “Can neuroscience identify lies?” A Judge’s Guide to Neuroscience: A Concise Introduction. Gazzaniga M (ed). University of California, Santa Barbara, 2011.

5.      Kozel FA, Johnson KA, Mu Q, Grenesko EL, Laken SJ, et al. Detecting deception using functional magnetic resonance imaging. Biological Psychiatry. Oct; 58(8):605-613 (2005).

6.      Podlesny JA, Raskin DC. Effectiveness of Techniques and Physiological Measures in the Detection of Deception. Psychophysiology. 15(4):344-59 (1978).

7.      Spence SA. The deceptive brain. Sournal of the Royal Society of Medicine. Jan; 97(1):6-9 (2004).

8.      The Polygraph and lie detection. National Academies of Science, 2003.

9.      Discovery channel.